জীববৈচিত্র্যঃ
জিনগত প্রকরণে, প্রজাতির বিভিন্নতায়, বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্যে জীবের যে বিভিন্ন প্রকারের সমারোহ দেখা যায়, তাকে জীববৈচিত্র্য বা বায়োডাইভারসিটি বলে।
অথবা,
কোনো নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত বিভিন্ন প্রকার জীবের (উদ্ভিদ, প্রাণী ও জীবাণুর) সমষ্টিকে ওই সময়ে ওই স্থানের জীববৈচিত্র্য বলে।
জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বঃ
1. খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বঃ
মানুষসহ সমস্ত প্রাণীকুল খাদ্যের জন্য অন্যান্য প্রাণী বা সবুজ উদ্ভিদের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। শস্য, ভোজ্য তেল, দুধ, ডিম, মাংস, ফল, সবজি ইত্যাদি সকল খাদ্যের জন্যই মানুষ বিভিন্ন জীবের ওপর নির্ভর করে। বর্তমানে মানুষের খাদ্যের চাহিদা মেটাতে বিকল্প খাদ্য হিসেবে নানা প্রজাতির জীবকে (যেমন—Chlorella, Spirulina বিভিন্ন পতঙ্গ) খাদ্যের নবতম উৎস হিসেবে খাদ্যতালিকায় সংযোজন করা হয়েছে। বর্তমানে জৈব প্রযুক্তির মাধ্যমে সৃষ্ট উচ্চফলনশীল উদ্ভিদ প্রজাতি প্রচুর পরিমাণ খাদ্যের উৎস।
2. ড্রাগ এবং ওষুধ প্রস্তুতিতে গুরুত্বঃ
পেনিসিলিন, রেসারপিন, মরফিন, কুইনাইন ইত্যাদি ওষুধ আমরা উদ্ভিদ থেকে পেয়ে থাকি। হোমিওপ্যাথি, অ্যালোপাথি, আয়ুর্বেদ ইত্যাদি বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতিতে ব্যবহৃত সমস্ত ধরনের ওষুধের ৪০%-এর মূল উপাদান আসে উদ্ভিদ বা প্রাণী থেকে। যেমন—ইউ (yew) বৃক্ষ থেকে প্রাপ্ত ট্যাক্সল (taxol) মানুষের ডিম্বাশয় ও স্তনগ্রন্থির ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। মানুষের হৃৎপিণ্ড এবং বৃক্ক প্রতিস্থাপনের পরবর্তী ধাপের চিকিৎসায় ছত্রাক থেকে প্রাপ্ত সাইক্লোস্পোরিন ব্যবহৃত হয়।
3. বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বঃ
বিভিন্ন প্রাকৃতিক পরিবেশে বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী বসবাস করে এবং তাদের পারস্পরিক আন্তঃক্রিয়ায় প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষিত হয়। প্রত্যেকটি বাস্তুতন্ত্রের জৈবিক উপাদানগুলি পরস্পরের সঙ্গে খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে যুক্ত। কোনো কারণে খাদ্যশৃঙ্খল বিঘ্নিত হলে বাস্তুতন্ত্রে তার প্রভাব পড়ে। বাস্তুতন্ত্রে একটি প্রজাতির বিলুপ্তি, অন্য প্রজাতির বিপন্নতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই কোনো বাস্তুতন্ত্রে জীব প্রজাতির সংখ্যা যত সেই বস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বা স্থিতিশীলতা তত বাড়বে। বাস্তুতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে যেমন বাস্তুতন্ত্রের উৎপাদন ক্ষমতা মোটামুটি স্থির থাকে, তেমন বছরের বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক চাপ সহ্য করার ক্ষমতা বেশি থাকে বা বহিরাগত প্রজাতির অনুপ্রবেশের প্রভাব প্রতিহত করার ক্ষমতাও বেশি থাকে।
4. জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বঃ
বিভিন্নপ্রকার উদ্ভিদ পরিবেশদূষণ রোধ করে। ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ইত্যাদি অণুজীব পরিবেশ থেকে দূষিত পদার্থ অপসারণ করে। উদ্ভিদ পরিবেশে অক্সিজেনের সঠিক মাত্রা বজায় রাখতে, বৃষ্টিপাত ঘটাতে, ভূমিক্ষয় রোধে, বন্যা নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করে।
5. অর্থনৈতিক গুরুত্বঃ
বস্ত্র, বাসস্থান ও দৈনন্দিন ব্যাবহারিক প্রয়োজনে মানুষ বিভিন্নপ্রকার উদ্ভিদ ও প্রাণীর ওপর নির্ভরশীল। মানুষ উদ্ভিদ প্রজাতি থেকে কাঠ, কাগজ, তন্তু, রবার, ছাপার কালি, রং, বার্নিশ, আঠা, রজন, ট্যানিন ইত্যাদি পায়, আর প্রাণী থেকে খাদ্যসামগ্রী ছাড়াও চামড়া, পালক, রেশম, লাক্ষা, উল ইত্যাদি সংগ্রহ করে। সুতরাং, জীববৈচিত্র্য অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বহু সম্পদ মানুষকে উপহার দেয়।
6. শিল্প ও সাহিত্যে প্রভাবঃ
বন্যপ্রাণীদের কেন্দ্র করে সাহিত্যিক, কবি, শিল্পীরা বিভিন্ন গল্প-কাহিনি রচনা করেন। চিড়িয়াখানা, বোটানিক্যাল গার্ডেন, মিউজিয়াম ইত্যাদি মানুষের চিত্ত বিনোদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিক্ষার্থীরাও এইসকল স্থান ভ্রমণের মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মানুষের মনকে আকর্ষণ করে।
