জীবনবিজ্ঞানঃ জীববৈচিত্র্য হ্রাস

 


জীববৈচিত্র্যের হ্রাসঃ 

জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তির বা বিপন্নতার প্রধান কারণগুলি হল—

[১] বাসস্থান অবলুপ্তিঃ

পৃথিবীব্যাপী জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে, জমি ব্যবহারের রীতির পরিবর্তনের ফলে বনাঞ্চল ধ্বংস করে নগর ও শহর পত্তন, শিল্পাঞ্চল স্থাপন, কৃষি সম্প্রসারণ ইত্যাদির ফলে অরণ্যের আয়তন ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। অরণ্য ধ্বংসের ফলে প্রাণীদের বসতি খণ্ডীভবন ঘটছে ও তাদের প্রাকৃতিক বাসস্থান ধ্বংস হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ত্রিপুরা রাজ্যের গভীর অরণ্য ধ্বংসের কারণে একটি স্থানীয় প্রজাতি ‘লজ্জাবতী বাঁদর’-এর অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়েছে।

[২] শিকার এবং চোরাশিকারঃ 

অবৈধভাবে অতিরিক্ত হারে বন্যপ্রাণী হত্যা, বিশেষত দাঁত, চামড়া, শিং, লোম ইত্যাদির জন্য চোরাশিকার, কয়েকটি বিশেষ প্রাণীর (যেমন—একশৃঙ্গ গন্ডার, হাতি, বাঘ) অবলুপ্তির কারণ হয়ে উঠেছে। আবার ওষুধ ও খাদ্যের জন্য কোনো অঞ্চলে বিশেষ কোনো প্রজাতিকে অতিরিক্ত সংগ্রহের ফলে যেমন বহু মূল্যবান উদ্ভিদ নির্বিচারে নির্মূল হয়ে যাচ্ছে, তেমন বহু প্রাণীও হারিয়ে যাচ্ছে, যেমন—সার্ডিন, হেরিং, ইলিশ প্রভৃতি মাছ ও নানা ভেষজ উদ্ভিদ।

[৩] গ্লোবাল ওয়ার্মিং ও জলবায়ুর পরিবর্তনঃ 

মনুষ্যকৃত দূষণের ফলে উৎপন্ন গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে গ্লোবাল ওয়ার্মিং। এর ফলে বর্তমানে অসংখ্য প্রজাতি বিলুপ্ত হচ্ছে। বায়ুমণ্ডলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে আগামী দিনে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে জলে পরিণত হবে এবং এর ফলে সমুদ্র জলের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে। ফলস্বরূপ অপেক্ষাকৃত নীচু ভূ-ভাগ, যেমন সুন্দরবনের অধিকাংশ অঞ্চল, সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যাবে। পরিবর্তিত আবহাওয়ায় অভিযোজিত হতে না পারার জন্য পৃথিবীর 25% জীব প্রজাতি অদূর ভবিষ্যতে বিলুপ্ত হতে পারে।

[৪] দূষণঃ 

অত্যধিক জনস্ফীতির পরিণাম হিসেবে সৃষ্ট বিভিন্নপ্রকার দূষণের জন্য পরিবেশ প্রতিনিয়ত দূষিত হচ্ছে, এবং এই কারণে অসংখ্য জীবের অস্তিত্ব সংকটের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। ফলস্বরূপ, গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদ প্রজাতি, প্রাণী প্রজাতি, অণুজীব ইত্যাদির অস্তিত্ব বিপন্ন হচ্ছে ও কালক্রমে তারা পরিবেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। যেমন—ইউট্রোফিকেশনের জন্য জলজ বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি হচ্ছে।

[৫] অতিব্যবহারঃ 

কোনো বিশেষ প্রাণী বা উদ্ভিদের অর্থনৈতিক গুরুত্ব যদি খুব বেশি হয়, তবে জীবটির অধিক ব্যবহারের ফলে তাদের সংখ্যা কমতে পারে বা বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। যেমন—

(i) কস্তুরী মৃগঃ 

হিমালয়ের কস্তুরী মৃগ থেকে পাওয়া যায় মৃগনাভি যা থেকে নানারকম সুগন্ধি দ্রব্য তৈরি হয়। মানুষের সুগন্ধি দ্রব্যের চাহিদা মেটাতে গিয়ে প্রাণীটির অস্তিত্ব আজ সংকটাপন্ন।

(ii) লালচন্দনঃ 

উদ্ভিদটির অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে উদ্ভিদটির অস্তিত্ব আজ বিপন্ন।

[৬] প্রাকৃতিক দুর্যোগঃ 

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন—বন্যা, খরা, ভূমিকম্প, জলোচ্ছ্বাস, অতিবর্ষণ, ভূমিধস, অগ্ন্যুৎপাত ইত্যাদির কারণে যেমন কিছু জীব প্রজাতির বিলুপ্তি ঘটে তেমুনি অসংখ্য প্রজাতির পপুলেশনে সদস্য সংখ্যা নিদারুণভাবে হ্রাস পায়। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে একটি বাস্তুতন্ত্রের বিলুপ্তি ঘটলে জীববৈচিত্র্যও হ্রাস পায়।

[৭] বহিরাগত প্রজাতির অনুপ্রবেশঃ 

কোনো স্থানে বহিরাগত প্রজাতির অনুপ্রবেশের ফলে ওই স্থানের পুরোনো কিছু প্রজাতির সংখ্যা হ্রাস পায় অথবা বিলুপ্ত হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, মরিশাস দ্বীপপুঞ্জে অসংখ্য ডোডো পাখির বাস ছিল। সপ্তদশ শতাব্দীতে ওলন্দাজ  পনিবেশকারীরা এই দ্বীপপুঞ্জে বসবাসকালে কুকুর ও শূকরের প্রতিপালন প্রবর্তন করে। কুকুর ও শূকরের অত্যাচারে ডোডো পাখি পৃথিবী থেকে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায়।


Previous
Next Post »

Popular Posts