জীবনবিজ্ঞানঃ দূষণের ধারণা

 


দূষণ (pollution)

বাস্তুবিজ্ঞানী ওডাম (1971)-এর মতানুসারে, পরিবেশের জল, মাটি ও বায়ুর মধ্যে কোনো অনভিপ্রেত পদার্থের অনুপ্রবেশের ফলে তার ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তনে যখন কোনো জীবের, সামাজিক পরিবেশের বা প্রাকৃতিক সম্পদসমূহের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দেয়, তাকে দূষণ বলে।

দূষক পদার্থঃ 

যেসব জৈব ও অজৈব পদার্থের উপস্থিতি বা মাত্রাবৃদ্ধি পরিবেশে অবাঞ্ছিত পরিবর্তনের সৃষ্টি করে এবং যার ফলে সমগ্র জীবজগৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাদেল দূষক পদার্থ বলে।

যেমন— কার্বন ডাই অক্সাইড, মিথেন, ধোঁয়া ইত্যাদি ।

বায়ুদূষণঃ 

মানুষের কার্যের ফলে বা কোনো প্রাকৃতিক কারণে যখন বায়ুমণ্ডলে অবাঞ্ছিত পদার্থের সমাবেশ ঘটে বা তাদের পরিমাণ স্বাভাবিক অপেক্ষা বেশি হয়, এবং ফলস্বরূপ জীবজগতের ক্ষতি সাধিত হয়, তখন ওই বায়ুকে দূষিত বায়ু বলে এবং এই সামগ্রিক পরিস্থিতিকে বায়ুদূষণ বলে।

বায়ুদূষণের কারণঃ 

গ্রিনহাউস গ্যাসঃ 

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে উপস্থিত CO2, জলীয় বাষ্প ইত্যাদি কয়েকটি গ্যাসীয় পদার্থ একত্রে গ্রিনহাউসের কাচের মতো কাজ করে। এগুলি পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে বিকিরিত তাপকে মহাশূন্যে ফিরে যেতে না দিয়ে ভূপৃষ্ঠ ও তৎসংলগ্ন বায়ুমণ্ডলকে উত্তপ্ত রাখে এবং জীবজগতের বেঁচে থাকার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে। একে গ্রিনহাউস প্রভাব (greenhouse effect) বলে। ও এই গ্যাসগুলিকে গ্রিনহাউস গ্যাস বলে।

গ্রিনহাউস গ্যাসগুলির মধ্যে  যে গ্যাসগুলি অধিকমাত্রায় বায়ুদূষণ সৃষ্টি করে, তাদের নাম এবং উৎস নীচে উল্লেখ করা হল।

কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO2) : 

এটি গ্রিনহাউস গ্যাসগুলির মধ্যে সর্বপ্রধান। গ্রিনহাউস প্রভাব সৃষ্টিতে এই গ্যাস প্রায় 56 শতাংশ দায়ী। কলকারখানার ধোঁয়া, মোটরগাড়ির ধোঁয়া, জীবাশ্ম-জ্বালানির দহন, অতিরিক্ত অরণ্যনিধনের ফলে বায়ুমণ্ডলে CO2-এর মাত্রা ক্রমেই বাড়ছে।

মিথেন (CH4) : 

এর বিকিরিত তাপ আবদ্ধ করার ক্ষমতা CO2-এর তুলনায় 25 গুণ বেশি। গ্রিনহাউস প্রভাব সৃষ্টিতে এই গ্যাস প্রায় 18 শতাংশ দায়ী। জৈব পদার্থের দহন, জলাজমিতে জৈব পদার্থের পচন, কয়লার উৎপাদন প্রভৃতির ফলে বায়ুমণ্ডলে মিথেনের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ক্লোরোফ্লুরোকার্বন (CFC) : 

বিকিরিত তাপ আবদ্ধ করার ক্ষমতা CO2 এর তুলনায় 15,000-20,000 গুণ বেশি। গ্রিনহাউস প্রভাব সৃষ্টিতে CFC-এর অবদান প্রায় 13 শতাংশ। রেফ্রিজারেটর ও এয়ার কনডিশনার থেকে লিকেজ, তরল প্রসাধনী দ্রব্য স্প্রে, ফোমজাতীয় পদার্থকে ফাঁপিয়ে তোলার কাজে ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করার জন্য দ্রাবকরূপে ব্যবহৃত CFC বায়ুতে নির্গত হয়।

নাইট্রাস অক্সাইড (N2O) : 

তাপ আবদ্ধ করার ক্ষমতা CO2-এর তুলনায় প্রায় 200 গুণ বেশি। গ্রিনহাউস প্রভাব সৃষ্টিতে গ্যাসটির অবদান 6 শতাংশ। জীবাশ্ম জ্বালানির দহন, রাসায়নিক সারের বিঘটন ও দাবানল বায়ুমণ্ডলে N2O-এর পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সমীক্ষায় দেখা গেছে, বায়ুমণ্ডলে বর্তমান হারে গ্রিনহাউস গ্যাসগুলি (প্রধানত CO2) পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে আগামী 2030 সালের মধ্যে পৃথিবীর এর পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাবে।

2. বাতাসের ডাসমান কণাসমূহ ও এরোসোলঃ 

বিভিন্ন কঠিন ও তরল পদার্থের কণাসমূহ বাতাসে ভাসমান অবস্থায় থাকে। এগুলি আকারে প্রায় 10um এরও কম হয়, এদের বাতাসের ভাসমান কণা বা SPM (Suspended Particulate Matter) বলে। আবার এগুলি অনেকসময় 1um -এর থেকেও ছোটো হয়। এদের এরোসোল বলে। ভাসমান কণাগুলির মধ্যে ধোঁয়া, ধূলিকণা, ধাতব অক্সাইডের কণা, অ্যাসবেস্টস কণা, সিলিকা কণা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

বায়ুদূষণের ফলাফলঃ 

1. অম্লবৃষ্টিঃ 

বাতাসে ভাসমান বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ (যেমন—Song

NO2 প্রভৃতি গ্যাস) বৃষ্টির জল অথবা শিশির ও তুষারের সঙ্গে মিশে বিক্রিয়া করে সালফিউরিক অ্যাসিড, নাইট্রিক অ্যাসিড তৈরি করে। এগুলি ভূপৃষ্ঠে পতিত হলে, তাকে অম্লবৃষ্টি (Acid Rain) বলে। 1872 সালে Robert August প্রথম অ্যাসিড রেন শব্দটি ব্যবহার করেন।

অম্লবৃষ্টির প্রভাবঃ 

পরিবেশের ওপর অম্লবৃষ্টির বিভিন্ন ক্ষতিকারক প্রভাব লক্ষ করা যায় — 

(ক) অম্লবৃষ্টির ফলে বেশিরভাগ জলাশয়ের মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর মৃত্যু ঘটে। জল পানের অযোগ্য হয় এবং জলের ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন ও জুপ্ল্যাঙ্কটন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই কারণে ইউরোপ এবং আমেরিকায় অম্লবৃষ্টিকে লেক-কিলার (lake-killer) বলে।

(খ) স্থলভাগে গাছপালা, কৃষিজ ফসল ধ্বংস হয়। 

(গ) মাটির অম্লত্ব বৃদ্ধি পায়, মাটির উর্বরতা হ্রাস পায়, শস্যের ফলন ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল ধ্বংস হয়ে যায়। মাটিতে বসবাসকারী বিভিন্ন প্রাণী ও অণুজীব মারা যায়। 

(ঘ) মানুষের ত্বক ও কোশের অস্বাভাবিক ক্ষতি হয়। 

(ঙ) বিষাক্ত রাসায়নিক লবণ পানীয় জলের সঙ্গে মিশে মানুষের শরীরে চলে যায়। এর ফলে বহু মানুষ পেটের অসুখে এবং আরও বিভিন্ন রোগে ভোগে। 

(চ) অম্লবৃষ্টির ফলে মানুষের তৈরি বিভিন্ন পাথরের (বিশেষত মার্বেলের) স্থাপত্য নিদর্শনগুলি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। আগ্রার তাজমহল, দিল্লির লালকেল্লা, জামা মসজিদ, কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল প্রভৃতি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অম্লবৃষ্টির প্রভাবে পাথরের ক্ষয়ীভবনকে স্টোন ক্যানসার বা স্টোন লেপ্রসি বলে।

2. ফুসফুসের রোগঃ 

বায়ুতে কার্বন মনোঅক্সাইডের পরিমাণ বেশি হলে মনুষের মাথাধরা এবং শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। কার্বন মনোক্সাইড রক্তের হিমোগ্লোবিনের সঙ্গে মিশে হিমোগ্লোবিনের অক্সিজেন বহন ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। হাইড্রোকার্বনের অসম্পূর্ণ জারণের ফলে নির্গত বেঞ্জোপাইরিন ফুসফুসের ক্যানসার সৃষ্টি করে। বায়ুতে মাত্রাতিরিক্ত সালফার ডাইঅক্সাইড থাকলে শ্বাসকষ্ট বা হাঁপানি এবং অন্যান্য ফুসফুসের রোগ দেখা দেয়। বায়ুতে তেজস্ক্রিয় পদার্থের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে ক্যানসার ছাড়াও জন্মের সময়েই দৈহিক বিকৃতি পরিলক্ষিত হয়। এ ছাড়া বায়ুদূষণের ফলে কয়লাখনি অঞ্চলে কুলিদের ব্ল্যাক লাং (black lung) নামক রোগ এবং অ্যাসবেস্টস (asbestos) পাইপ নির্মাণকারীদের আসবেস্টোসিস (asbestosis) নামক রোগ হতে দেখা যায়।

জলদূষণ (Water Pollution) 

জলের সঙ্গে কোনো অবাঞ্ছিত দ্রব্য মিশ্রিত হওয়ার ফলে যদি জলের ভৌত, রাসায়নিক ও জৈব বৈশিষ্ট্যসমূহ পরিবর্তিত হয় এবং তার ফলে জলজ প্রাণী, উদ্ভিদ ও মানুষের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দেয়, তবে জলের ওইরূপ দূরবস্থাকে জলদূষণ বলে।

বিজ্ঞানী সাউথউইক (1976)-এর মতে—‘মানুষের ক্রিয়াকলাপের ফলে এবং প্রাকৃতিক কারণে জলের ভৌত, রাসায়নিক এবং জৈব উপাদানগুলির গুণমান নষ্ট হয়ে যাওয়াই হল জলদূষণ'।

জলদূষণের কারণঃ 

1. কৃষিক্ষেত্রের বর্জ্যঃ 

কৃষিকাজে নাইট্রেট, ফসফেটজাতীয় রাসায়নিক সার এবং বিভিন্ন প্রকার কীটনাশক ও আগাছানাশক ব্যবহৃত হয়। এগুলি বৃষ্টির জলে বাহিত হয়ে বিভিন্ন জলাশয়ে ও নদীতে গিয়ে জমা হয়। এর ফলে জল দূষিত হয়।

2. জীবাণুঃ 

বিভিন্ন প্রকার রোগসৃষ্টিকারী জীবাণু, যেমন— ব্যাকটেরিয়া, প্রোটোজোয়া, নিমাটোড, ছত্রাক, কৃমিজাতীয় প্রাণী ইত্যাদি জলদূষণ ঘটায়। 

জলদূষণের ফলাফলঃ 

1. রোগঃ 

ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, প্রোটোজোয়া, কৃমি প্রভৃতি নানা দূষিত জলে উপস্থিত থেকে মানবদেহে নানা রোগ সৃষ্টি করে। যেমন—

(i) হেপাটাইটিস ভাইরাসের সংক্রমণে হেপাটাইটিস রোগের সৃষ্টি হয়।

(ii) ভিব্রিও কলেরি, সালমোনেল্লা টাইফি ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণে যথাক্রমে কলেরা ও টাইফয়েড রোগের সৃষ্টি হয়।

(iii) এন্টামিবা হিস্টোলাইটিকা, জিয়ার্ডিয়া প্রভৃতি আদ্যপ্রাণীর সংক্রমণে যথাক্রমে আমাশয়, জিয়ার্ডিয়েসিস রোগের সৃষ্টি হয়।

(iv) গোলকৃমির সংক্রমণে অ্যাসকেরিয়েসিস রোগের সৃষ্টি হয়।

2. ইউট্রোফিকেশন 

সংজ্ঞাঃ

যে পদ্ধতিতে কোনো জলাশয়ের প্রচুর পরিমাণে জৈবিক ও খনিজ পরিপোষক সঞ্জিত হওয়ার ফলে শৈবাল জাতীয় উদ্ভিদের ব্যাপক বৃদ্ধি ঘটে এবং জলে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা যায়, তাকে ইউট্রোফিকেশন বলে।

ইউট্রোফিকেশনের কারণঃ 

(ক) কৃষিকাজে ব্যবহৃত পতঙ্গনাশক, ছত্রাকনাশক, রাসায়নিক সার প্রভৃতি ধৌত হয়ে জলাশয়ে সঞ্চিত হওয়া।

(খ) কৃষিজমিতে ব্যবহৃত ফসফেট সার জলাশয়ে সঞ্চিত হওয়া।

(গ) জামাকাপড় ধৌত করার কাজে ব্যবহৃত ডিটারজেন্ট থেকে ফসফেট বিভিন্ন জলাশয়ে পতিত হওয়া।  

(ঘ) জলাশয়ে শিল্পজাত বর্জ্য, প্রাণী ও মনুষ্যসৃষ্ট বর্জ্য পদার্থের পতিত হওয়া। 

(ঙ) ভূমিক্ষয়জনিত কারণে জলাশয়ে পলি বা বালির অবক্ষেপণ। 

(চ) জলাশয়ে বহিরাগত আগাছায় সংযোজন ঘটা অথবা আবর্জনা ফেলার ফলে অজৈব পরিপোষকের বৃদ্ধি পাওয়া।

ইউট্রিফিকেশনের প্রভাবঃ 

(ক) বদ্ধ জলাশয়ে শৈবালের সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটে এবং জলে অক্সিজেনের পরিমাণ হ্রাস পায়। ফলে শৈবালের পচন ঘটে এবং জল দুষিত হয়। একে শৈবাল ব্লুম (algal bloom) বঙ্গে।

(খ) জলদূষণের ফলে জলজ প্রাণীর মৃত্যু ঘটে। ওই দূষিত জল পান করে বহু গবাদিপশুর মৃত্যু ঘটার সম্ভাবনা থাকে। 

(গ) ইউট্রোফিকেশনের ফলে বিভিন্ন জলাশয়ের নাব্যতা কমে যায়।

মাটিদূষণঃ 

প্রাকৃতিক বা মনুষ্যসৃষ্ট কারণে মাটিতে বিভিন্ন প্রকার অবাঞ্ছিত পদার্থ মেশার ফলে মাটির গুণাবলি বা ধর্ম এবং পুষ্টি মৌল নষ্ট হয়ে মানুষ ও পরিবেশের ক্ষতিসাধন হলে, তাকে মৃত্তিকাদূষণ বলে।

মৃত্তিকাদূষণের কারণঃ 

1. জীবাণুঃ 

মাটির সজীব দূষক হল—ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, প্রোটোজোয়া, কৃমি ইত্যাদি। এদের উৎস হল পৌর আবর্জনা,

হাসপাতালের বর্জ্য, মানুষ ও প্রাণীর মলমূত্র, আবর্জনা প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রের নিঃসৃত বর্জ্য পদার্থ ইত্যাদি।

2. রাসায়নিক পদার্থঃ 

অত্যধিক ফলনের আশায় বর্তমানে আধুনিক পদ্ধতিতে কৃষিকাজ করা হচ্ছে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কীটনাশক প্রয়োগ ক্ষতিকারক পতঙ্গদের ধ্বংস করছে ঠিকই কিন্তু, সেই পদার্থ মাটিতে মিশে মাটিতে বসবাসকারী কেঁচো, নাইট্রোজেন সংশ্লেষকারী বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া ইত্যাদিকে নষ্ট করছে। এর ফলে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে এবং ওই কীটনাশকগুলি মাটিতে জমে মাটির অম্লত্ব বৃদ্ধি করে, যার ফলস্বরূপ মাটি বন্ধ্যা হয়ে উঠেছে।

ফলাফলঃ 

1. মানুষের ওপর প্রভাব : সরাসরি মাটির সঙ্গে স্পর্শ বা প্রশ্বাসের নানা মাধ্যমে মাটিদূষক দেহে প্রবেশ করলে বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি হয়, যথা—

(i) পোলিওমায়োলাইটিস ভাইরাসের সংক্রমণে শিশুদের পোলিও রোগের সৃষ্টি হয়। 

(ii) রোটা ভাইরাসের সংক্রমণে শিশুদের উদরাময় ঘটে।

(iii) ব্যাকটেরিয়া ও কৃমির সংক্রমণে শিশুদের বিভিন্ন ধরনের রোগ হয়।

2. জৈব বিবর্ধন (Biomagnification): 

যে প্রক্রিয়ায় জৈব-অভঙ্গুর বা বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করলে প্রতিটি পুষ্টিস্তরে তাদের ঘনত্ব বৃদ্ধি পায়, তাকে জৈববিবর্ধন বলে।  সাধারণত খাদ্যশৃঙ্খলের পুষ্টিস্তর বরাবর প্রবাহকালে, প্রাথমিক স্তরের তুলনায় সর্বোচ্চ স্তরে দূষকের ঘনত্ব স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি হয়।

জৈববিবর্ধন সৃষ্টিকারী দূষকঃ 

যেসব পদার্থ জৈববিবর্ধন ঘটায় তাদের জৈবদূষক বলে। এইপ্রকার রাসায়নিক পদার্থগুলি সাধারণত অভঙ্গুর প্রকৃতির হয়। কয়েক প্রকার জৈবদূষক হল – BHC (বেঞ্জিন হেক্সাক্লোরাইড), DDT (ডাইক্লোরো ডাইফিনাইল ট্রাইক্লোরোইথেন), PBC (পলিক্লোরিনেটেড বাই ফিনাইল),  HCG (হেক্সা ক্লোরোসাইক্লোহেক্সেন), PCDB (পলি-ক্লোরিনেটেড ডাইবেঞ্জো ডাই অক্সিন), অ্যালড্রিন প্রভৃতি পেস্টনাশক এবং বেঞ্জোপাইরিন, পাইরিন, ন্যাপথালিন প্রভৃতি পলি-নিউক্লিয়ার অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন।

শব্দদূষণঃ 

মানুষের সহনশীল মাত্রার অতিরিক্ত শব্দ, যা মানুষের পক্ষে অস্বস্তিকর হয়, শরীর ও মনের ওপর বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করে এবং স্বাভাবিক সাম্যাবস্থার বিঘ্ন ঘটায়, তাকে শব্দদূষণ বলে।

শব্দদূষণের কারণঃ 

1. যানবাহনঃ 

(ক) মোটরগাড়ি সৃষ্ট শব্দদূষণঃ 

মোটর গাড়ি, বাস, ট্রাম, লরি, ট্রাক ইত্যাদি যানবাহনের চলাচলের সময় ইঞ্জিনের শব্দ ছাড়াও এয়ার হর্ন বাজানোর ফলে অতিমাত্রায় শব্দদূষণ ঘটে।

(খ) বিমান সৃষ্ট শব্দদূষণঃ 

এরোপ্লেন, হেলিকপ্টার ইত্যাদি ওঠা-নামা এবং চলাচলের সময় ভীষণমাত্রায় শব্দদূষণের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া সুপারসোনিক বিমান ও জেটপ্লেন চলাচলের ফলেও শব্দদূষণ ঘটে।

(গ) রেল সৃষ্ট শব্দদূষণঃ 

রেল চলাচলের সময়, স্টেশনে যাত্রী ওঠানামার সময় এবং ট্রেনের হুইসেলের থেকে ভীষণভাবে শব্দদূষণের সৃষ্টি হয়।

2. শিল্পঃ 

(ক) শিল্পকারখানায় বিভিন্ন যন্ত্রের ঘর্ষণের ফলে প্রচণ্ড শব্দের সৃষ্টি হয় এবং শব্দদূষণ ঘটে।

(খ) গৃহস্থালির বিভিন্ন যন্ত্রপাতি (যেমন—মিক্সার গ্রাইন্ডার, ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, ওয়াশিং মেশিন ইত্যাদি) এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতি (যেমন—জেনারেটর, ঢালাই মেশিন, গম ভাঙানো মেশিন ইত্যাদি) থেকে শব্দদূষণের সৃষ্টি হয়।

শব্দদূষণের প্রভাবঃ 

1. মানুষের ওপর প্রভাবঃ 

(ক) কানের ওপর প্রভাবঃ 

দীর্ঘদিন 100 dB শব্দের মধ্যে কাটালে কানের অর্গান অফ্ কর্টির কোশগুলি একেবারে নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে বধিরতা দেখা দেয়। 160 dB-এর শব্দের মধ্যে দীর্ঘ সময় কাটালে কানের পর্দা ফেটে যায়, ফলে সম্পূর্ণ বধিরতার সৃষ্টি হয়।

(খ) হৃৎপিণ্ডের ওপর প্রভাবঃ 

দীর্ঘদিন বিকট আওয়াজের সংস্পর্শে কাটালে হৃৎস্পন্দন অনিয়মিত হয়। এর ফলে ধমনির রক্তচাপ বেড়ে যায় বা কমে যায়। রক্তে ক্যালশিয়ামের মাত্রা, গ্লুকোজের মাত্রা এবং শ্বেতকণিকার মাত্রার পরিবর্তন ঘটে।

(গ) মস্তিষ্কের ওপর প্রভাবঃ 

অতিরিক্ত শব্দের মধ্যে দীর্ঘ সময় কাটালে মানুষের স্নায়ুতন্ত্র (বিশেষত স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্র) প্রভাবিত হয়, ফলে মানুষের হাঁটা-চলায় অসুবিধা হয়। এ ছাড়া মানসিক অবসাদ সৃষ্টি হয়, স্মৃতিশক্তি হ্রাস পায়, একাগ্রতা নষ্ট হয়, অনিদ্রা শুরু হয় এবং শরীরে বিভিন্ন প্রকার অস্বস্তির সৃষ্টি হয়।

(ঘ) ফুসফুস ও চোখের ওপর প্রভাবঃ 

তীব্র শব্দের প্রভাবে মানুষের নিশ্বাস-প্রশ্বাসের হার বৃদ্ধি পায়। শব্দদূষণের ফলে মানুষের চোখের তারারন্ধ্র ঠিকমতো প্রসারিত হয় না এবং দৃষ্টিশক্তির ত্রুটি লক্ষ করা যায়।

2. অন্যান্য প্রাণীর ওপর প্রভাবঃ 

(ক) কুকুর, বিড়াল এবং অন্যান্য বন্য প্রাণীরা জোরাল শব্দ সহ্য করতে পারে না, সেই সঙ্গে জোরালো আওয়াজ নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করতে বা শিকার ধরতে বাধার সৃষ্টি করে। 

(খ) বিভিন্ন প্রাণী এবং পাখির প্রজনন ক্ষমতার ওপর শব্দদূষণের প্রভাব পড়ে। এর ফলে বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়,  যার ফলে মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।


Previous
Next Post »

Popular Posts