ভারতের জলসম্পদঃ হ্রদ, জলাশয়, খালের বন্টন ও মানবজীবনে এদের গুরুত্বঃ
হ্রদঃ
ভারতে খুব বড় হ্রদ নেই। যে সব হ্রদ আছে তাদের সংখ্যাও খুব বেশী নয়।
[ক] উত্তর ভারতের বিভিন্ন হ্রদঃ
(১) হিমালয় পর্বতের কুমায়ুন অঞ্চলে অনেকগুলো মিষ্টি জলের বড় বড় হ্রদ দেখা যায়। কুমায়ুন অঞ্চলের হ্রদকে ‘তাল’ বলে, যেমন : নৈনি তাল, ভীম তাল, সাত তাল, নাউকুচিয়া তাল, পুনা তাল, মালওয়া তাল, খুরপা তাল প্রভৃতি। নৈনি তাল এই সব তালের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
(২) ভুঞ্জ উপত্যকার হেমকুণ্ড এবং নন্দাঘুন্টির রূপকুণ্ড এই অঞ্চলের বিখ্যাত হ্রদ।
(৩) কাশ্মীর হিমালয়ের উল্লেখযোগ্য মিষ্টি জলের হ্রদ হল ডাল, উলার, দুধনাগ, হরনাগ প্রভৃতি।
(৪) এই অঞ্চলের লাদাখ-এ সল্টলেক, পাংগং, সো-মোরারি প্রভৃতি লবণাক্ত হ্রদ দেখা যায়।
(৫) মণিপুরের লকটাক হল উত্তর-পূর্ব ভারতের বিখ্যাত হ্রদ।
(৬) রাজস্থানের হ্রদগুলো আবার লবণাক্ত, এদের মধ্যে সম্বর, পুষ্কর, দিদওয়ানা, পাচদ্র প্রভৃতি হ্রদগুলো উল্লেখযোগ্য। এই অঞ্চলে এই সব লবণাক্ত হ্রদগুলোকে প্লায়া বলে।
এই সব হ্রদ ছাড়াও গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর মধ্য এবং নিম্ন গতিতে বহু অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ দেখা যায়।
[খ] দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন হ্রদঃ
(১) পূর্ব ভারতের বঙ্গোপসাগরের উপকূলের চিল্কা হল ভারতের বৃহত্তম হ্রদ।
(২) অন্ধ্রপ্রদেশের কৃষ্ণা ও গোদাবরী নদীর ব-দ্বীপের মধ্যবর্তী অংশে কোলেরু হ্রদটি অবস্থিত।
(৩) তামিলনাড়ু রাজ্যের চেন্নাই শহরের কাছে পুলিকট নামে অগভীর উপহ্রদটি অবস্থিত।
(৪) চিল্কা, কোলেরু, পুলিকট প্রভৃতি উপহ্রদের চারিদিক হ্রদের মত স্থল বেষ্টিত নয়। এদের একদিক সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত, তাই এদের জল লবণাক্ত।
(৫) আরব সাগরের উপকূলবর্তী কেরল রাজ্যের মালাবার উপকূলের উপহ্রদগুলোকে ‘কয়াল 'বলে। এদের মধ্যে কোচিনের কাছে ভেমবানাদ-কয়াল এবং কুইলনের কাছে অষ্টমুদি কয়াল উল্লেখযোগ্য।
হ্রদের গুরুত্বঃ
(1) ভারতের স্বাদুজলের হ্রদগুলি থেকে সেচের মাধ্যমে জল সংগ্রহ করে কৃষিকাজ করা হয়।
(2) হ্রদ অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও আরামদায়ক জলবায়ু পর্যটন শিল্প গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। যেমন—ডাল, উলার, চিল্কা ইত্যাদি।
(3) মৎস্য আহরণের ক্ষেত্রে হ্রদগুলি (ওড়িশার চিল্কা হ্রদ) বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করে।
জলাশয়ঃ
ভারতের যেসব স্থানের ভূমি কঠিন ও শিলাময় এবং কুপ খনন সম্ভব নয়, সেই সকল স্থানে বাঁধের সাহায্যে কৃত্রিম জলাধার সৃষ্টি করে বৃষ্টিপাতের জল বা নদীর জল ধরে রাখা হয়, একে জলাশয় বলে। সাধারণত, দুই ধরনের জলাশয় সৃষ্টি করা হয়, যেমন—ক্ষুদ্র জলাশয় এবং বৃহৎ জলাশয়।
নদী উপত্যকার সমতল অঞ্চলে নদীর ওপরবাঁধ দিয়ে বিশাল আয়তনের জলাশয় নির্মাণ করা হয়।
বণ্টনঃ
দাক্ষিণাত্য মালভূমির নদী উপত্যকার মাঝে মাঝে বাঁধ দিয়ে জলাশয় সৃষ্টি করে জলসেচ করা হয়। অন্ধ্রপ্রদেশের নাগার্জুন সাগর জলাধার (কৃষ্ণা নদী), কর্ণাটকের তুঙ্গভদ্রা জলাধার (তুঙ্গভদ্রা নদী), ওড়িশার হীরাকুঁদ জলাধার (মহানদী) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। ভারতের অন্যান্য রাজ্যের জলাধারগুলির মধ্যে পাঞ্জাবের ভাকরা জলাধার (শতদ্রু নদী), নাঙ্গাল জলাধার, রাজস্থানের রাণাপ্রতাপ সাগর জলাধার, জওহরসাগর জলাধার (চম্বল নদী), পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার সীমানায় মাইথন জলাধার, পাঞেৎ জলাধার, তিলাইয়া জলাধার (দামোদর নদী) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
জলাশয়ের গুরুত্বঃ
1. ভারতের মোট সেচসেবিত কৃষিজমির প্রায় 17% কৃষিজমিতে জলাশয়ের মাধ্যমে জলসেচ করা হয়।
2. দক্ষিণ ভারতে অবনমিত অঞ্চলে বা নদী উপত্যকায় বাঁধ দিয়ে বর্ষার অতিরিক্ত জল আটকে জলাশয় নির্মাণ করার যথেষ্ট সুবিধা আছে।
খালঃ
ভারতের বর্তমানে অধিকাংশ কৃষিজমিতে খাল দ্বারা জলসেচ হয়ে থাকে। মোট সেচকবলিত কৃষিজমির প্রায় 40% কৃষিজমিতে খালের মাধ্যমে জলসেচ করা হয়। ভারতের খালগুলি প্রধানত দু-ধরনের। যথা—নিত্যবহ খাল এবং প্লাবন খাল।
খালের গুরুত্বঃ
1. এই পদ্ধতিতে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ কৃষিজমিতে সেচ করা হয়।
2. বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।
3. প্রধানত উচ্চ ফলনশীল বীজ ও উন্নত পদ্ধতিতে কৃষিকাজে
এই ধরনের জলসেচ সর্বাধিক কার্যকরী হয়।
4. মৃত্তিকার আর্দ্রতার স্থায়িত্বের জন্য এই পদ্ধতি সবচেয়ে সুবিধাজনক।
