ভারতের জলবায়ুর নিয়ন্ত্রকসমূহঃ
[১] অবস্থান ও অক্ষাংশগত বিস্তৃতিঃ
ভারত এশিয়া মহাদেশে অবস্থিত এবং উত্তরে ৩৭°৬′ উত্তর অক্ষাংশ থেকে দক্ষিণে ৮°৪′ উত্তর অক্ষাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত। এছাড়া কর্কটক্রান্তি রেখা (২৩°৩০′ উত্তর অক্ষাংশ) ভারতের প্রায় মধ্যভাগ দিয়ে গিয়েছে। ফলে অক্ষাংশ অনুসারে ভারতের উত্তরাংশ নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডলে এবং ভারতের দক্ষিণাংশ উষ্ণমণ্ডলে অবস্থিত। দক্ষিণ ভারত উষ্ণমণ্ডলে অবস্থিত হলেও সমুদ্র-সান্নিধ্য ও উচ্চতার জন্য এখানকার তাপমাত্রা অনেক কম হয়।
[২] হিমালয় পর্বতের ভূমিকাঃ
(ক) হিমালয় পর্বতের অবস্থান ভারতীয় উপমহাদেশকে
মধ্য এশিয়ার হাড় কাঁপানো শীতের হাত থেকে রক্ষা করেছে। হিমালয় পর্বত না থাকলে শীতকালে ভারতেও রাশিয়া ও চীনের মত তীব্র শীতের প্রাবল্য দেখা যেত।
(খ) বঙ্গোপসাগর থেকে আসা মৌসুমী বায়ু মেঘালয়ের খাসি পাহাড়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে অনেক উঁচুতে উঠে যায় এবং প্রবল শৈত্যে ঘনীভূত হয়ে খাসি পাহাড়ের দক্ষিণ ঢালের চেরাপুঞ্জি ও মওসীনরাম অঞ্চলে প্রবল বৃষ্টিপাত ঘটায় (বছরে গড়ে প্রায় ১৩৯২ সেন্টিমিটার)। কিন্তু চেরাপুঞ্জির নিকটবর্তী মেঘালয়ের রাজধানী শহর শিলং খাসি পাহাড়ের উত্তর ঢালের বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ার জন্য শিলং সহ মেঘালয় রাজ্যের উত্তরাংশে বৃষ্টিপাত হয় তুলনামূলকভাবে অনেক কম (বছরে ১৫০-২৩০ সেন্টিমিটার)।
[৩] ভারতের ভূপ্রকৃতিঃ
ভারতের ভূপ্রকৃতি জলবায়ুকে নিয়ন্ত্রিত করে। যেমন—দক্ষিণ ভারতে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও অধিক উচ্চতার কারণে উটি বা অন্যান্য উঁচু অঞ্চলের তাপমাত্রা কম। পশ্চিম উপকূলে পশ্চিমঘাট পর্বতের অবস্থানের জন্য পশ্চিম দিকে বৃষ্টিবহুল এবং পূর্বদিকে বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।
[৪] সমুদ্র সান্নিধ্যঃ
ভারতের দক্ষিণাংশ তিনদিক সমুদ্রবেষ্টিত হওয়ায় সমুদ্রবায়ু ও স্থলবায়ুর প্রভাবে উপকূলীয় জলবায়ু সমভাবাপন্ন হয়। অন্যদিকে সমুদ্র থেকে দূরে দেশের অভ্যন্তরে জলবায়ু চরমভাবাপন্ন প্রকৃতির।
[৫] মৌসুমী বায়ুর প্রভাবঃ
মৌসুমী বায়ুর দ্বারা প্রভাবিত ভারতীয় জলবায়ুর নিম্নলিখিত গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলো দেখা যায়, যেমনঃ
(ক) ভারতে গ্রীষ্মকাল আর্দ্র এবং শীতকাল শুকনো হয়।
(খ) শীতকালে মৌসুমী বায়ু যে দিক থেকে প্রবাহিত হয় গ্রীষ্মকালে ঠিক তার বিপরীত দিক থেকে প্রবাহিত হয়।
(গ) ভারতে বৃষ্টিপাত একটানা না হয়ে মাঝে মাঝে বৃষ্টিপাতে বিরতি ঘটে।
(ঘ) ভারতে মৌসুমী বৃষ্টিপাতের চরম অনিশ্চয়তার জন্য কোন বছর অনাবৃষ্টি ও খরা এবং কোন বছর অতিবৃষ্টি এবং বন্যা দেখা যায়, যা দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
[৬] জেট বায়ুঃ
ভারতীয় স্থলভাগের উচ্চ অঞ্চলে জেট বায়ু প্রবাহিত হয়, যা ভারতীয় জলবায়ুকে প্রভাবিত করে। যেমন -
(a) শীতকালে উপক্রান্তীয় অঞ্চলের ওপর দিয়ে পশ্চিমী জেট বায়ু তীব্র গতিতে প্রবাহিত হওয়ার ফলে ভারতে পশ্চিমীঝঞ্ঝার আগমন ঘটে।
(b) মে-জুন মাসে সূর্যের উত্তরায়ণের সময় জেট বায়ুর গতির দিক পরিবর্তিত হয়ে পূর্বমুখী হওয়ায় (পূবালি ক্রান্তীয় জেট বায়ু) দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর আগমন ঘটায়।
[৭] ক্রান্তীয় ঘূর্ণবাত ও পশ্চিমীঝঞ্ঝাঃ
(i) আরবসাগর ও বঙ্গোপসাগরে মে-জুন মাসে লম্ব সূর্যকিরণে এবং অক্টোবর নভেম্বর মাসে মৌসুমি বায়ুর কারণে ক্রান্তীয় ঘূর্ণবাতের সৃষ্টি হয়।
(ii) শীতকালে বায়ুরচাপ বলয় দক্ষিণে 5°-10° সরে যাওয়ার ফলে উত্তর-পশ্চিম ভারত পশ্চিমাবায়ুর অন্তর্গত হয়। ফলে ভূমধ্যসাগর থেকে আগত আর্দ্র পশ্চিমাবায়ু দুর্বল ঘূর্ণবাত (Depression)-এর সৃষ্টি করে এবং মাঝে মাঝে হালকা বৃষ্টি ও পার্বত্য অঞ্চলে তুষারপাত ঘটায়। একে পশ্চিমীঝঞ্ঝা বলে।
[৮] এল-নিনোর প্রভাবঃ
একটি দক্ষিণমুখী অস্থির উন্ন সমুদ্রস্রোত এল নিনোর সামনে দক্ষিণ এশিয়ায় জেট বায়ু দুর্বল হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়। ফলে মৌসুমি বায়ু ভারতে দেরিতে আসে এবং কম বৃষ্টিপাতের কারণে ক্ষরার সৃষ্টি হয়।
[৯] লা - নিনার প্রভাবঃ
একটি উত্তরমুখী অতিশীতল সমুদ্রস্রোত (পেরু স্রোত ও হামবোল্ড) লা-নিনার প্রভাবে ভারত মহাসাগর থেকে উষ্ণ আর্দ্র বায়ুর ব্যাপক ঊর্ধ্বগমন ঘটে, তথা ভারতে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটাতে সাহায্য করে।
