মৃত্তিকা ক্ষয়ঃ
মৃত্তিকাক্ষয়ের সংজ্ঞাঃ
হিমবাহ, জলস্রোত, সমুদ্রের ঢেউ, বায়ুপ্রবাহ বা মানুষের নানান রকম অবাঞ্ছিত কার্যকলাপের ফলে মাটির ওপরের হাল্কা অংশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে অপসারিত হলে, তাকে মৃত্তিকাক্ষয় বলে।
■ মৃত্তিকাক্ষয়ের কারণঃ
[ক] প্রবাহমান জলধারাঃ
জলপ্রবাহের দ্বারা মৃত্তিকা ক্ষয় প্রধানত চার রকমের হয়ে
থাকে, যেমনঃ
(১) স্তরক্ষয়ঃ
প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে কোন বিশাল অঞ্চলের মাটির ওপরের স্তর কম বেশী সমানভাবে ধুয়ে গিয়ে অপসারিত হলে, তাকে স্তর ক্ষয় বলে। ভারতের দাক্ষিণাত্য মালভূমি এবং সিন্ধু-গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র সমভূমি অঞ্চলে এভাবে মৃত্তিকা ক্ষয় হতে দেখা যায়।
(২) নালি ক্ষয় বা ক্ষুদ্র খাত ক্ষয়ঃ
যেখানে মাটির স্তর একটু কোমল ও শিথিল প্রকৃতির, সেখানে প্রবল জলধারার আঘাতে অনেক সময় মাটির স্তর ক্ষয় পেতে পেতে নালি অথবা ছোট খাতের আকারে ভূমিক্ষয় হয়, এই রকম ভূমিক্ষয়কে নালীক্ষয় বা ক্ষুদ্রখাত ক্ষয় বলে। ভারতে হিমালয়সহ বিভিন্ন পার্বত্য অঞ্চলের পাদদেশে এই রকম ভূমিক্ষয় হতে দেখা যায়।
(৩) প্রণালী ক্ষয় বা খাত ক্ষয়ঃ
মাটির গঠন হালকা হলে কৃষিক্ষেত্র বা উন্মুক্ত প্রান্তরে অতি ক্ষুদ্র জলধারার দ্বারা সৃষ্টি হওয়া ছোট ছোট খাঁজগুলো ক্ষয়প্রাপ্ত হতে হতে ক্রমশ বৃহৎ খাতে পরিণত হয়, এই রকম ভূমিক্ষয়কে প্রণালী ক্ষয় বলে। পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতন অঞ্চলে এই ধরণের ভূমিক্ষয়কে খোয়াই বলে। মধ্যপ্রদেশের চম্বল উপত্যকা, হিমালয় পর্বতের পাদদেশ, গুজরাটও আরাবল্লী পর্বতের পূর্বাংশে এই ধরনের ভূমিক্ষয় বেশী দেখা যায়। চম্বল উপত্যকার এই রকম বৃহৎ খাতবিশিষ্ট অঞ্চলকে ‘বীহড়' বলে।
(৪) সমুদ্র ক্ষয়ঃ
সমুদ্র তরঙ্গের আঘাতে উপকূল অঞ্চলে ভাঙ্গন ও ক্ষয়ের সৃষ্টি হলে তাকে সমুদ্র ক্ষয় বলে।
সমুদ্র ক্ষয় বলে।
[খ] বায়ু প্রবাহ ক্ষয়ঃ
প্রধানত মরুভূমি ও মরুপ্রায় অঞ্চলে বনভূমি, গাছপালা প্রভৃতি বাধা না থাকার জন্য প্রবলবেগে বায়ু প্রবাহের ফলে এই অঞ্চলের শিথিল ও সুক্ষ মাটি অথবা বালির কণিকাগুলো সহজেই অন্যত্র অপসারিত হয়ে যায়, এই রকমভাবে মৃত্তিকা ক্ষয়কে বায়ুপ্রবাহ ক্ষয় বলে।
[গ] বৃষ্টিপাতের প্রকৃতিঃ
প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে ভূমিক্ষয় বেশি হয়, কম বৃষ্টিপাতযুক্ত অঞ্চলে ভূমিক্ষয়ের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম।
[ঘ] ভূপ্রকৃতিঃ
ভূমির প্রকৃতি ও ভূমির ঢাল মৃত্তিকা ক্ষয়কে প্রভাবিত করে। কোনো অঞ্চলে ভূমিভাগের ঢাল বেশি হলে জলের পৃষ্ঠপ্রবাহ দ্রুততর হয় এবং মৃত্তিকা ক্ষয় বেশি হয়।
[ঙ] জনসংখ্যার চাপঃ
বর্তমানে পৃথিবীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় মৃত্তিকার ওপর চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থাৎ অত্যধিক পরিমাণ জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বসতি নির্মাণ, খাদ্যের চাহিদাপূরণ, শিল্পায়ন প্রভৃতির জন্য মৃত্তিকা ক্ষয় ঘটছে।
[চ] অনিয়ন্ত্রিত পশুচারণঃ
গরু, ছাগল প্রভৃতি গৃহপালিত পশু অনিয়ন্ত্রিতভাবে যেখানে সেখানে চড়ালে জমির মাটি অনাচ্ছাদিত হয়ে বৃষ্টির জলে ক্ষয় প্রাপ্ত হয়।
[ছ] অবৈজ্ঞানিক খননঃ
পার্বত্য অঞ্চলে হোটেল নির্মাণ, মালভূমি অঞ্চলে খনিজ সম্পদ আহরণ, সমভূমি অঞ্চলে নগরায়ণ প্রভৃতির ফলে অবৈজ্ঞানিক প্রথায় মৃত্তিকায় খনন কার্য করা হচ্ছে ফলে মৃত্তিকা ক্ষয় ঘটছে।
[জ] ভূমিধসঃ
পার্বত্য অঞ্চলে ভূমিধসের ফলে প্রচুর মৃত্তিকা ক্ষয় ঘটে।
[ঝ] বৃক্ষচ্ছেদনঃ
উদ্ভিদ শিকড়ের সাহায্যে মৃত্তিকাকে দৃঢ়ভাবে আটকে রেখে ক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করে। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বসতি নির্মাণ, খাদ্যের চাহিদা পূরণের জন্য · কৃষিজমির সম্প্রসারণ এবং কাঠের চাহিদার জন্য যথেচ্ছ হারে গাছ কাটার ফলে মৃত্তিকা ক্ষয় ঘটে।
[ঞ] প্রথাগত কৃষি পদ্ধতিঃ
ত্রিপুরা, অসম, উত্তরবঙ্গ, মেঘালয় প্রভৃতি উত্তর পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ী অঞ্চলে অবৈজ্ঞানিক প্রথায় জুম চাষ ও ধাপ চাষ করা হয়। এর ফলে মাটির উর্বরাশক্তি হ্রাস পায় ও মৃত্তিকা ক্ষয় ঘটে।
■ ভারতের মৃত্তিকাক্ষয় অঞ্চলঃ
আরাবল্লীর পূর্বাংশ, রাজস্থান সমভূমি, চম্বল উপত্যকা, হিমালয়ের পাদদেশ অঞ্চল, গুজরাটের পূর্বাংশ, গঙ্গা ব্রহ্মপুত্র সমভূমি, মধ্যপ্রদেশের পশ্চিম অংশ, পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ, তামিলনাড়ু ও অন্ধ্রপ্রদেশে ভূমিক্ষয়ের পরিমাণ সর্বাধিক।
