ভারতের শিল্পঃ শিল্প স্থাপনের কারণসমূহ

 
ভারতের শিল্প  
এই নিবন্ধে ভারতের শিল্প সম্পর্কে সামগ্রিক আলোচনা করা হয়েছে। ছাত্রছাত্রীরা যদি নিবন্ধটি ভালো করে পড়ে তবে মাধ্যমিক পরীক্ষায় এই অধ্যায় থেকে সব প্রশ্নের উত্তর করতে পারবে । 
ভারতের শিল্প 
শিল্প স্থাপনের  কারণসমূহ 
প্রাকৃতিক কারণঃ 
1. কাঁচামালঃ
কাঁচামালের রূপ পরিবর্তনের ফলেই শিল্পজাত দ্রব্য উৎপাদিত হয়। সব শিল্পেই এক বা একাধিক কাঁচামাল প্রয়োজন হয়। কাঁচামালের দাম, প্রাপ্তিস্থান থেকে শিল্পকেন্দ্রে আনার খরচ, কাঁচামালের প্রকৃতি বা গুণগত মান, কাঁচামালের সহজলভ্যতা ইত্যাদি শিল্পস্থাপনের অন্যতম কারণ।  
কাঁচামাল দু-ধরনের হতে পারে। যথা - 
(ক) অবিশুদ্ধ কাঁচামালঃ 
পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হলে যদি কোনো কাঁচামাল ওজনে হ্রাস পায় বা হীনভার হয়ে পড়ে, তবে সেই কাঁচামালকে ওজন-হ্রাসমান বা অবিশুদ্ধ কাঁচামাল বলে। যেমন—আকরিক লোহা, বক্সাইট, ইক্ষু ইত্যাদি।
যেসব শিল্পে ওজন-হ্রাসমান (weight-loosing) বা অবিশুদ্ধ (impure) কাঁচামাল ব্যবহার করা হয়, সেই শিল্পগুলিকে কাঁচামালের উৎসের কাছে গড়ে তোলা হলে তারা উন্নত ও লাভজনক হতে পারে (যেমন—চিনি শিল্প)। 
(খ) বিশুদ্ধ কাঁচামালঃ 
যে সব কাঁচামালকে শিল্পজাত দ্রব্যে পরিণত করলে ওজনের কোনো তারতম্য ঘটে না, তাদের বিশুদ্ধ কাঁচামাল বলে। 
যেমন— তুলো, রেশম প্রভৃতি।
2. জলের জোগানঃ
যে-কোনো শিল্পেই জলের প্রয়োজন হয়। কেবল শিল্পেই নয়, শিল্পকে কেন্দ্র করে যেসব শ্রমিক নিকটবর্তী স্থানে বসবাস করে তাদের ব্যবহারের জন্যও প্রচুর জলের প্রয়োজন হয়। এই কারণে যেসব স্থানে জলের প্রাচুর্য আছে সেইসব স্থানে শিল্পকারখানা গড়ে ওঠে। লোহা ও ইস্পাত শিল্পে জলের প্রয়োজন বেশি বলে এই শিল্প সাধারণত নদী বা হ্রদের তীরে অথবা ভূগর্ভস্থ জল পাওয়ার সুবিধা আছে, সেইসব স্থানে গড়ে ওঠে। যেমন—ইস্পাতনগরী জামশেদপুর সুবর্ণরেখা ও খরকাই নদীর সংগমে গড়ে উঠেছে। এইভাবে শিল্পকে অনুকূল অবস্থানে গড়ে তোলা সম্ভব হলে শিল্পের উন্নতি ঘটে।
3. বিদ্যুৎশক্তিঃ 
শক্তির অব্যাহত জোগান শিল্পের উন্নয়নের অপরিহার্য শর্ত। এই কারণে অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে জলবিদ্যুৎ শক্তি এবং অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে কয়লাখনিকে কেন্দ্র করে শিল্পের বিকাশ শুরু হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্পের একদেশীভবনের ইতিহাস লক্ষ করলে দেখা যায় যে, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপেলেশিয়ান অঞ্চল, জার্মানির রূঢ়, ভারতের দামোদর উপত্যকা, ইউক্রেনের দনেৎস্ক অববাহিকায় অসংখ্য শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। বর্তমানে অবশ্য কয়লার পরিবর্তে খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার ক্রমবর্ধমান। এ ছাড়া, পারমাণবিক শক্তি, ভূতাপ শক্তি, সৌরশক্তি ইত্যাদি উৎসের নিকটেও বহু শিল্প গড়ে উঠছে। যেমন—ভারতে হিরাকুদ ও রিহান্দ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাছে অ্যালুমিনা উৎপাদনের কারখানা স্থাপিত হয়েছে।
অর্থনৈতিক কারণঃ 
1. পরিবহনঃ
শিল্পের উন্নতিতে পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। পরিবহন মাধ্যমগুলিকে চার ভাগে ভাগ করা যায়। যথা—(I) সড়ক, (ii) রেল, (iii) জল ও (iv) বিমান পরিবহন। শিল্পের উন্নয়নের জন্য সঠিক পরিবহন মাধ্যম নির্বাচন করা একান্ত জরুরি। যেমন—
(ক) সড়ক পরিবহনঃ 
অল্প দুরত্বের মধ্যে স্বল্প পরিমাণ মালের জন্য সড়ক পরিবহন সবচেয়ে লাভজনক।
(খ) রেল পরিবহনঃ 
দেশের অভ্যন্তরে মাঝামাঝি দৈর্ঘ্যের দূরত্বের মধ্যে ভারী মাল পরিবহনের জন্য রেল পরিবহন সড়ক পরিবহনের তুলনায় নির্ভরযোগ্য এবং লাভজনক।
(গ) জল পরিবহনঃ 
এক দেশ থেকে অন্য দেশে বা বিশাল দূরত্বের মধ্যে ভারী মাল প্রচুর পরিমাণে পরিবহনের জন্য জল পরিবহন সবচেয়ে সস্তা।
(ঘ) বিমান পরিবহনঃ 
খুব দামি বা অতি দ্রুত পচনশীল বা যেসব জিনিস সত্বর পৌঁছানো দরকার, এমন ধরনের পণ্য (যেমন—ফুল, ওষুধ, ত্রাণসামগ্রী) পরিবহনের জন্য বিমানপথ ব্যবহার করলে শিল্প উন্নত ও লাভজনক হয়।
2. শ্রমিকঃ 
যে - কোনো শিল্প গড়ে উঠতে দরকার হয় শ্রমিকের জোগান। তবে শিল্পের অবস্থানের ওপর প্রভাব ভিন্ন ভিন্ন শিল্পে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের হয়। পোশাক, চর্ম, বয়ন, ধাতু, যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিন যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক প্রভৃতি মজুরি ব্যায় উৎপাদন ব্যিয়ের এক-তৃতীয়াংশ থেকে দুই-পঞ্চমাংশ পর্যন্ত হয়। স্বাভাবিকভাবেই এই শিল্পকারখানাগুলিকে ও উন্নত করার জন্য যেখানে মজুরি কম সেখানে গড়ে তোলা হয়। আধুনিক বিশ্বায়নের যুগে শিল্পের অবস্থান ও শিল্পের উন্নতির ওপর শ্রমিকের অবস্থানের প্রভাব ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। কারণ বড়ো বড়ো বহুজাতিক সংস্থাগুলি পৃথিবীর যেখানেই দক্ষ শ্রমিক পাওয়া যায়, সেখান থেকে শ্রমিক সংগ্রহ করে নিজেদের সংস্থায় তাদের নিয়োগ করছে। আউটসোর্সিং-এর ক্ষেত্রে ভারতীয় শ্রমিকদের বিশেষ চাহিদা আছে।
3. বাজারঃ
কোনো শিল্পের বিকাশের ওপর উৎপাদিত পণ্যের ব্যাপক চাহিদা বা বাজার নির্ভরশীল। তাই উন্নত দেশগুলির জনবহুল অঞ্চলে অতি উন্নত বাজার ব্যবস্থার জন্য অধিক শিল্পের সমাবেশ ঘটেছে। 
4.মূলধনঃ
যে-কোনো শিল্প স্থাপনে জমি ক্রয়, কারখানা তৈরি, যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল সংগ্রহ, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, শ্রমিকের মজুরি, উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে প্রচুর মূলধনের প্রয়োজন। 
এ ছাড়া 5. জলবায়ু, 6. আধুনিক প্রযুক্তিবিদ্যা, 7. সরকারি নীতি প্রভৃতি বিষয়গুলি শিল্প স্থাপনকে প্রভাবিত করে। 
কাঁচামালভিত্তিক শিল্পের শ্রেণিবিভাগ (Classification of Industries on the Basis of the Nature of Raw Materials):
কাঁচামালের উৎস, প্রকৃতি অনুসারে শিল্পকে প্রধানত চার ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন—
(1) কৃষিজ শিল্পঃ
উদাহরণ : চা শিল্প, কার্পাস বস্ত্ৰবয়ন শিল্প ইত্যাদি। 
(2) প্রাণীজ শিল্পঃ
ডেয়ারি শিল্প, পশম-বয়ন শিল্প, রেশম, লাক্ষা
শিল্প ইত্যাদি। 
(3) বনজ শিল্পঃ কাগজ, দেশলাই, প্লাইউড, মধু, মোম, আসবাবপত্র নির্মাণ শিল্প প্রভৃতি। 
(4) খনিজ শিল্পঃ
লৌহ-ইস্পাত, তামা, অ্যালুমিনিয়াম, স্বর্ণ, রৌপ্য শিল্প প্রভৃতি।

Previous
Next Post »

Popular Posts