মৃত্তিকার শ্রেণিবিভাগঃ
জলবায়ু, স্বাভাবিক উদ্ভিদ, শিলার প্রকৃতি, মাটির বুনন, গঠন, রং, শিলালক্ষণ অনুসারে ভারতের বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আঞ্চলিক মাটিকে নানা ভাবে ভাগ করা যায়। এই সমস্ত মাটিতে জৈব পদার্থ, অম্লতা, ক্ষারকীয়তা, জলধারণ ক্ষমতা প্রভৃতির তারতম্য দেখা যায়। সাধারণভাবে ভারতের মাটিকে 6টি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে । এগুলো হলোঃ
● (১) পলিমৃত্তিকা [অনাঞ্চলিক মাটি]
[ক] অবস্থানঃ
শতদ্রু গঙ্গা সমভূমি, ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা ও বিভিন্ন নদী উপত্যকাগুলিতে পলিমাটি দেখা যায়।
[খ] বৈশিষ্ট্যঃ
[i] নদীতীরবর্তী অঞ্চলে পলি, বালি, কাদা প্রভৃতি জমে এইরূপ অনাঞ্চলিক মাটির সৃষ্টি হয়। নদীর প্রবাহপথের উঁচু অংশে প্রাচীন পলিমাটিকে ভাঙ্গর এবং নদী-তীরবর্তী
নবীন পলিমাটিকে খাদার বলা হয়।
[ii] ভাঙ্গর মাটি অপেক্ষাকৃত অনুর্বর। অনেক সময় অধিক
ধৌত প্রক্রিয়ার প্রভাবে এইরূপ মাটিতে চুনজাতীয় পদার্থের আধিক্য দেখা যায়। এরূপ মাটিকে কংকর বা ঘুটিং বলে।
[iii] অপেক্ষাকৃত শুষ্ক অঞ্চলে ঊষর, কালার প্রভৃতি নুন ও ক্ষারধর্মী প্রাচীন পলিমাটি দেখা যায়।
[iv] খাদার মাটি খুবই উর্বর। গঠন অনুযায়ী এই মাটিকে বেলে,
এঁটেল ও দোয়াঁশ—এই তিনভাগে ভাগ করা হয়।
[গ] কৃষির ওপর প্রভাবঃ
পলিমাটিতে নানা ধরনের জৈব পদার্থ ও খনিজ পদার্থ থাকায় তা অত্যন্ত উর্বর। এরূপ মাটি কৃষিকাজের পক্ষে বিশেষ উপযোগী। ভারতের অধিকাংশ খাদ্যশস্য পলিমাটিতে উৎপন্ন হয়। ধান, গম, পাট, আখ, ডাল, বিভিন্ন তেলবীজ, মিলেট প্রভৃতি প্রধান কৃষিজ দ্রব্য।
● (২) কৃষ্ণ মৃত্তিকা [আঞ্চলিক মাটি]
[ক] অবস্থানঃ
মহারাষ্ট্র, গুজরাট, পশ্চিম মধ্যপ্রদেশ, কর্নাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তামিলনাড়ুর কিছু অংশে কালো মাটি দেখা যায়।
[খ] বৈশিষ্ট্যঃ
লাভা-গঠিত ব্যাসল্ট শিলার আবহবিকারের ফলে এরূপ মাটির সৃষ্টি হয়েছে। এই মাটির স্থানীয় নাম রেগুর বা রেগাড়া (তেলেগু শব্দ)। কাদা ও পলির ভাগ বেশি থাকে বলে এই মাটির জলধারণ ক্ষমতা বেশি। এছাড়া এই মাটিতে লোহা, চুন, ক্যালসিয়াম কার্বনেট, ম্যাগনেসিয়াম, অ্যালুমিনা, পটাশ প্রভৃতি বেশি থাকে। কালো রঙের এই মাটি তাই অত্যন্ত উর্বর।[গ] কৃষির ওপর প্রভাবঃ
কালো মাটি অত্যন্ত উর্বর বলে এই মাটি তুলা চাষের পক্ষে বিশেষ উপযোগী। এই কারণে এই মাটিকে ‘কৃষ্ণ তুলা মৃত্তিক’ও বলা হয়। এছাড়া আখ, গম, জোয়ার, চীনাবাদাম, তামাক প্রভৃতি এই মাটির উল্লেখযোগ্য ফসল।
● (৩) লোহিত মৃত্তিকা [আঞ্চলিক মাটি]
[ক] অবস্থানঃ
প্রায় সমগ্র দাক্ষিণাত্য মালভূমি, সাঁওতাল পরগণা, ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ, উত্তর প্রদেশের কিছু কিছু স্থানে লাল মাটি দেখা যায়।
[খ] বৈশিষ্ট্যঃ
রূপান্তরিত প্রাচীন গ্রানাইট ও নিস শিলার আবহবিকারের ফলে এরূপ মাটির সৃষ্টি হয়েছে। এরূপ মাটিতে কাদা ও বালির পরিমাণ প্রায় সমান থাকে। ফেরিক অক্সাইডের পরিমাণ বেশি থাকে বলে মাটির রঙ লাল। এরূপ মাটির জলধারণ ক্ষমতা খুব কম।
[গ] কৃষির ওপর প্রভাবঃ
লাল মাটি অনুর্বর। এরূপ মাটিতে তাই তেমন কৃষিকাজ করা যায় না। তবে জলসেচের সাহায্যে জোয়ার, বাজরা, রাগী, বিভিন্ন তেলবীজ, স্বল্প ধান প্রভৃতির চাষ করা হয়।
● (৪) ল্যাটেরাইট মাটি [আঞ্চলিক মাটি]
[ক] অবস্থান কর্নাটক ও কেরলের পশ্চিমঘাট পার্বত্য অঞ্চলে, ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তামিলনাড়ুর পূর্বঘাট পার্বত্য অঞ্চলে, ছোটনাগপুর মালভূমির পূর্বাংশে, অসম ও মেঘালয়ের পাহাড়ী অঞ্চলে ল্যাটেরাইট মাটি দেখা যায়।
[খ] বৈশিষ্ট্যঃ
ল্যাটিন শব্দ 'ল্যাটার-এর অর্থ ইট। ইটের মত শক্ত ও লাল রঙের বলে এই মাটির নাম ল্যাটেরাইট। অধিক বৃষ্টিযুক্ত অঞ্চলে ধৌত প্রক্রিয়ার ফলে মাটির ওপরের স্তরের সিলিকা মাটির নিচের স্তরে চলে যায় ও মাটির ওপরে লোহা ও অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এই মাটির জলধারণ ক্ষমতা খুব কম।
[গ] কৃষির ওপর প্রভাবঃ
ল্যাটেরাইট মাটি কৃষিকাজের অনুপযোগী। বর্তমানে জলসেচ ও রাসায়নিক সারের ব্যবহার করে কাজুবাদাম, ট্যাপিওকা, ধান, চা প্রভৃতি শস্যের চাষ করা হচ্ছে।
● (৫) মরু অঞ্চলের মাটি [আঞ্চলিক মাটি]
[ক] অবস্থানঃ
রাজস্থানের বাগর ও মরুস্থলী অঞ্চলে, কচ্ছের রন অঞ্চলে এবং পাঞ্জাবহরিয়ানার কিছু কিছু অংশে এরূপ মাটি দেখা যায়।
[খ] বৈশিষ্ট্যঃ
অতি স্বল্প বৃষ্টিপাতের জন্য এই অঞ্চলে ধৌত প্রক্রিয়া বিশেষ দেখা যায় না। অধিক বাষ্পীভবনের ফলে মাটির উপরিভাগে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, সোডিয়াম প্রভৃতি নুনের পরিমাণ বেশি থাকে। এই মাটি বালুকণা দ্বারা গঠিত বলে জলধারণ ক্ষমতা খুব কম। এই মাটির স্থানীয় নাম সিরোজেম।
[গ] কৃষির ওপর প্রভাবঃ
এইরূপ মাটিতে জৈব পদার্থ খুব বেশি থাকে। জলসেচের উপযুক্ত ব্যবস্থা থাকলে এরূপ মাটিতে উল্লেখযোগ্যভাবে কৃষিকাজ করা যায়। রাজস্থান-গঙ্গানগর খাল প্রকল্পের সাহায্যে এরূপ মাটিতে বর্তমানে গম, তুলা, জোয়ার, বাজরা প্রভৃতি ফসলের চাষ করা হয়।
● (৬) পার্বত্য মৃত্তিকা [আঞ্চলিক মাটি]
[ক] অবস্থানঃ
পূর্ব হিমালয় ও পশ্চিম হিমালয়ের উঁচু পার্বত্য অঞ্চলে, পশ্চিমঘাট ও নীলগিরির উঁচু অংশে উদ্ভিদের পাতা পচে এই ধরনের মাটির সৃষ্টি হয়।
[খ] বৈশিষ্ট্যঃ
পশ্চিম হিমালয় ও নীলগিরি পর্বতের উঁচু অংশে সরলবর্গীয় বনভূমির পাতা, কাণ্ড, ফল প্রভৃতির মিশ্রণে একপ্রকার অম্ল প্রকৃতির মাটির সৃষ্টি হয়। এরূপ মাটির রঙ ধূসর। একে পড়সল (রুশ শব্দ পসল = ধূসর) মাটি বলে। এরূপ মাটি অনুর্বর। পূর্ব হিমালয়ের উঁচু পার্বত্য অঞ্চলে ওক, লরেল, চেস্টনাট প্রভৃতি গাছের পাতা পচে এক ধরনের মাটির সৃষ্টি হয়। এরূপ মাটির অম্লত্বের পরিমাণ কম। একে ধূসর বাদামী অরণ্য মাটি বলে। এছাড়া পার্বত্য অঞ্চলের অন্যান্য অংশের মাটি পাথুরে বা দো-আঁশ বা কাদা দো-আঁশ প্রকৃতির। শিলা গঠনের তারতম্যে বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মাটিগোষ্ঠী পার্বত্য অঞ্চলে গড়ে উঠতে দেখা যায়।
[গ] কৃষির ওপর প্রভাবঃ পড়সল মাটি কৃষিকাজের অনুপযোগী। পূর্ব হিমালয়ের ধূসর বাদামী মাটিতে নানারকম ফলের চাষ করা হয়। অন্যান্য বিভিন্ন স্থানীয় মাটি, যেমন—কাশ্মীর উপত্যকার কারেয়া, হিমাচল প্রদেশের কাটিল (পাথুরে মাটি), আপরুন (কাঁকর মিশ্রিত বেলে মাটি), তালুন (কাদাটে দো-আঁশ) প্রভৃতি মাটিতে ধান, গম, বার্লি, আলু প্রভৃতির চাষ করা হয়।
এই প্রধান ভাগগুলি ছাড়াও নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে ভারতের মাটিকে নিম্নলিখিত উপবিভাগে ভাগ করা যায়।
(ক) উপকূলের মাটি
(খ) ব - দ্বীপ অঞ্চলের মাটি
(গ) পার্বত্য তৃণভূমির মাটি
(ঘ) হিমবাহ সৃষ্ট মাটি
(ঙ) তরাই অঞ্চলের মাটি

