মাধ্যমিক বাংলা
সিরাজদ্দৌলা নাট্যাংশ
রচনাধর্মী প্রশ্নাবলী
প্রতিটি প্রশ্নের মান ৪
১.১ ‘আমি জানিলাম না আমাদের অপরাধ’—‘আমি’ ও ‘আমাদের’ বলতে কাদের কথা বলা হয়েছে? এখানে কোন্ অপরাধের কথা বলা হয়েছে?
উত্তর:
শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের লেখা ‘সিরাজদ্দৌলা’ নাট্যাংশে উদ্ধৃতিটির বক্তা হলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধি ওয়াটস।
এখানে বক্তা ‘আমি’ বলতে নিজেকে এবং ‘আমাদের’ বলতে কোম্পানিকে বোঝাতে চেয়েছেন।
মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদ্দৌলা বাংলার মসনদে বসেন। সিংহাসনে বসার পর থেকেই ইংরেজ কোম্পানি তাকে উপেক্ষা ও অসহযোগিতা করতে থাকে। এর ফলে অপমানিত সিরাজ কলকাতা আক্রমণ করেন এবং কলকাতা জয় করে এর নতুন নামকরণ করেন আলিনগর।
কিন্তু অল্প সময়ের ব্যবধানে ওয়াটসন ও ক্লাইভ কলকাতাকে পুনরুদ্ধার করে সিরাজের সঙ্গে আলিনগরের সন্ধি স্বাক্ষর করেন। সন্ধির শর্ত সঠিকভাবে রূপায়ণের জন্য মুর্শিদাবাদের রকদরবারে ওয়াটস ইংরেজ প্রতিনিধি নিযুক্ত হন।
সিরাজের অভিযোগ সন্ধির শর্ত উপেক্ষা করে ওয়াটস্ তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন।ওয়াটস্কে লেখা অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের একটি চিঠি নবাবের হস্তগত হয়, যা থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যে নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তা প্রমাণিত হয়ে যায়। অন্যদিকে, ওয়াটসের লেখা একটি চিঠিও নবাব পেয়েছিলেন যেখানে সেই ষড়যন্ত্রে ওয়াটসের ভূমিকাটিও স্পষ্ট হয়।
এইভাবে নবাব যখন কোম্পানির যাবতীয় ষড়যন্ত্রের বিষয়টি দরবারে স্পষ্ট করে ওয়াটসের প্রাণদণ্ডের কথা তুলেছিলেন তখন ওয়াটস্ না জানার ভান করে উক্তিটি করেছেন।
১.২ তোমাকে আমরা তোপের মুখে উড়িয়ে দিতে পারি, জানো?’—‘তোমাকে’ ও ‘আমার’ বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে? উদ্দিষ্ট ব্যক্তির প্রতি এমন আচরণের কারণ কী?
উত্তর:
শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের লেখা ‘সিরাজদ্দৌলা’ নাট্যাংশে উদ্ধৃতিটির বক্তা হলেন স্বয়ং নবাব সিরাজদ্দৌলা।
উদ্ধৃত অংশে ‘তোমাকে’ বলতে মুর্শিদাবাদের রাজদরবারে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রেরিত প্রতিনিধি ওয়াটসের কথা বলা হয়েছে। অপরদিকে ‘আমরা’ বলতে বক্তা সিরাজদ্দৌলা স্বয়ং এবং তাঁর সৈন্যবাহিনী সহ অন্যান্য রাজকর্মচারীকে বুঝিয়েছেন।
মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদ্দৌলা বাংলার মসনদে বসেন। সিংহাসনে বসার পর থেকেই ইংরেজ কোম্পানি তাকে উপেক্ষা ও অসহযোগিতা করতে থাকে। এর ফলে অপমানিত সিরাজ কলকাতা আক্রমণ করেন এবং কলকাতা জয় করে এর নতুন নামকরণ করেন আলিনগর।
কিন্তু অল্প সময়ের ব্যবধানে ওয়াটসন ও ক্লাইভ কলকাতাকে পুনরুদ্ধার করে সিরাজের সঙ্গে আলিনগরের সন্ধি স্বাক্ষর করেন। সন্ধির শর্ত সঠিকভাবে রূপায়ণের জন্য মুর্শিদাবাদের রকদরবারে ওয়াটস ইংরেজ প্রতিনিধি নিযুক্ত হন।
সিরাজের অভিযোগ সন্ধির শর্ত উপেক্ষা করে ওয়াটস্ তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন।ওয়াটস্কে লেখা অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের একটি চিঠি নবাবের হস্তগত হয়, যা থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যে নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তা প্রমাণিত হয়ে যায়। অন্যদিকে, ওয়াটসের লেখা একটি চিঠিও নবাব পেয়েছিলেন যেখানে সেই ষড়যন্ত্রে ওয়াটসের ভূমিকাটিও স্পষ্ট হয়।
ষড়যন্ত্রকারীর একমাত্র শাস্তি যে মৃত্যু—এ কথা বোঝাতেই নবাব এমন আচরণ করেছেন।
১.৩ 'এই পত্র সম্বন্ধে তুমি কিছু জান?’— কে, উদ্দেশ্যে এই প্রশ্ন করেছেন? পত্রটি সম্বন্ধে যা জান লেখো।
অথবা,
‘মুন্সিজি, এই পত্রের মর্ম সভাসদদের বুঝিয়ে দিন।—পত্রটির মর্ম আলোচনা করো।
উত্তর:
রবীন্দ্র-পরবর্তী যুগের অন্যতম নাট্যকার নাট্যসংস্কারক শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের লেখা ‘সিরাজদ্দৌলা’ নাট্যাংশে স্বয়ং সিরাজ তাঁর রাজদরবারে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রেরিত প্রতিনিধি ওয়াটসের উদ্দেশ্যে এই প্রশ্ন করেছেন।
শত্রু পরিবেষ্টিত হয়েই বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবের সিংহাসন লাভ। সিংহাসন লাভের সময় থেকেই নবাবের চারিপাশে একদিকে নিজ আত্মীয় ও রাজকর্মচারীরা আর অন্যদিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিনিয়ত স্বার্থসিদ্ধির জন্য চক্রান্তের জাল বুনে চলেছিল।
আলিনগরের সন্ধির শর্ত রক্ষার্থে তাঁর দরবারে নিয়োজিত ইংরেজ প্রতিনিধি ওয়াটস ও কোম্পানির নৌসেনাপতি ওয়াটসনের মধ্যে চক্রান্তপূর্ণ যে দুটি চিঠির আদানপ্রদান হয়েছিল তা নবাবের হস্তগত হয়। উদ্ধৃত অংশে ওয়াটসনের চিঠিটির কথা বলা হয়েছে।
চিঠির শেষের দিকের কয়েকটি ছত্রে চক্রান্তের স্পষ্ট বার্তা পাওয়া যায়। নবাবের আদেশে মুনশি অনুবাদ করে যা শোনায় তার সারমর্ম হল, ক্লাইভের পাঠানো সৈন্য শীঘ্রই কলকাতায় পৌঁছোবে। সেনাপতি ওয়াটসন খুব শীঘ্রই মাদ্রাজে জাহাজ পাঠাবেন এবং কলকাতায় আরও সৈন্য ও কাছে জাহাজ পাঠানোর কথা জানাবেন। তাঁর উদ্যোগে বাংলায় আগুন জ্বলে উঠবে। অতএব এই চিঠির মূল উদ্দেশ্য সৈন্য সমাবেশ ঘটিয়ে বাংলা দখল করা।
১.৪ ‘জাতির সৌভাগ্য-সূর্য আজ অস্তাচলগামী;’—কোন্ জাতির কথা বলা হয়েছে? তার ‘সৌভাগ্য-সূর্য আজ অস্তাচলগামী’ বলার কারণ কী?
উঃ
নাট্যকার শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের ‘সিরাজদ্দৌলা’ নাট্যাংশের এই উদ্ধৃতিতে ‘বাঙালি জাতির’ কথাই বলা হয়েছে।
‘সিরাজদ্দৌলা’ নাট্যাংশে সিরাজ এই হতাশাব্যঞ্জক উক্তিটি করেন।
নবাব জাতির সৌভাগ্যসূর্য বলতে জাতির স্বাধীনতাকেই বুঝিয়েছেন। নবাব বুঝতে পারেন ব্রিটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে বাণিজ্য করতে এসে ভারতের অর্থনীতি, রাজনীতিতেও থাবা বসিয়েছে। তারা পলাশির যুদ্ধে সিরাজকে পরাস্ত করে বণিকের মানদণ্ডকে রাজদণ্ডে পরিণত করতে চান। অন্যদিকে মিরজাফর, জগৎশেঠ, রাজবল্লভ, রায়দুর্লভদের চক্রান্ত সিরাজকে দুর্বল করে দিয়েছিল।
ওয়াটসের উদ্দেশ্যে লেখা ওয়াটসনের চিঠি সিরাজের হাতে আসায় তিনি আতঙ্কিত হয়েছেন। সভায় সিরাজ প্রাথমিকভাবে শক্ত মনোভাবের পরিচয় দিলেও ঘরে বাইরের চক্রান্ত দেখে তিনি বুঝতে পেরেছেন একার পক্ষে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, তাই তিনি মিরজাফর, জগৎ শেঠ, রাজবল্লভ, রায়দুর্লভদের চক্রান্তের শাস্তির বদলে এই দুঃসময়ে তাঁদের পাশে থাকার অনুরোধ জানিয়েছেন।
সিরাজের কলকাতা আক্রমণকেই পলাশির যুদ্ধ বা ইংরেজদের কাশিমবাজার অভিযানের মূল কারণ বলে জগৎশেঠরা ব্যাখ্যা করেছেন। সিরাজ এক এক করে সব দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে এঁদের কাছে অনুরোধ করেন—বাংলার মানমর্যাদা রক্ষায় তাঁরা যেন নবাবকে শক্তি ও সাহস দিয়ে সর্বপ্রকারে সাহায্য করেন। জাফর আলিকে পরম আত্মীয় সম্বোধন করে পাশে থাকার অনুরোধ জানান। এই দুর্বল মুহূর্তে পলাশির যুদ্ধের পরিণাম সম্বন্ধে সিরাজের এই খেদোক্তি।
১.৫ ‘জানি না, আজ কার রক্ত সে চায়। পলাশি, রাক্ষসী পলাশি!’ বক্তার এরূপ মন্তব্যের কারণ কী? অথবা,
এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে বক্তার যে মানসিক ভাবনার পরিস্ফুটন ঘটেছে, তা আলোচনা করো।
উঃ
নাট্যকার শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের ‘সিরাজদ্দৌলা’ নাট্যাংশে উক্তিটির বক্তা বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদ্দৌলা। তিনি পলাশির যুদ্ধের অবধারিত পরিণামে আতঙ্কিত হয়ে লুৎফার সামনে এমন করুণ আর্তনাদ করেন।
মাত্র পনেরো মাসের রাজত্বকালে নবাব ঘরে-বাইরে প্রবল সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন।
তাঁর হাতে এসেছে ষড়যন্ত্রের নমুনা। ভরা দরবার কক্ষে তাঁকে হিংস্র, আগ্রাসী ওয়াটস্-এর মুখোমুখি হতে হয়। এই ইংরেজ প্রতিনিধির সঙ্গে হাত মিলিয়েছে মিরজাফর, রাজবল্লভ, জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ। এই চক্রান্তকারীদের সহায়তা অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের সাহস বাড়িয়েছে। তিনি সগর্বে ঘোষণা করেছে—‘বাংলায় আমি এমন আগুন জ্বালাইব, যাহা গঙ্গার সমস্ত জল দিয়াও নিভানো যাইবে না।’
আবার ওয়াটসের চিঠিতে লেখা ‘নবাবের উপর নির্ভর করা অসম্ভব। চন্দননগর আক্রমণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।’ এবং ঘসেটির আক্রমণাত্মক অভিসম্পাত নবাবকে বিচলিত করেছে। তাই তাঁর মুখে প্রকাশ পেয়েছে অন্তরের তীব্র বেদনা। এই তীব্র বেদনা থেকে তিনি লুৎফাকে বলেছেন—‘পনেরো মাসের নবাবী লুৎফা, তার মাঝে পুরো এক বছর যুদ্ধে, ষড়যন্ত্রভেদে, গুপ্তচর পরিচালনায় অতিবাহিত হয়েছে।' আসলে তিনি তাঁর শাসনকালে এমন সব অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন যেগুলির থেকে তিনি কোনো মানুষকে শ্রদ্ধাও করতে পারেন না বা ভালোওবাসতে পারেন না। ঠিক এইরকম পরিস্থিতির মধ্যেই পলাশির যুদ্ধের পদধ্বনি।
তিনি জানেন না পলাশির যুদ্ধ কতটা রক্ত চায়, কারণ যুদ্ধের পরিণতি সম্বন্ধে তিনি অনিশ্চিত। এই সবকিছুই নবাবের হতাশার প্রকাশ। তাঁর এটাও জানা ছিল যে এই যুদ্ধই হবে বাংলার অস্তিত্বরক্ষার চরম রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম। তাই ঘরে-বাইরে ক্ষতবিক্ষত নবাব পলাশি সম্পর্কে ধারণা দিতে গিয়ে লুৎফাকে এই কথাগুলি বলেন।
